সামাজিক বিজ্ঞাপন কী? সামাজিক বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন ধরন। cajbd.com

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপনের ইতিহাসে এমন একটা সময় ছিল যখন কোম্পানীগুলো শুধু ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের জন্য ব্যবসা করত এবং সে হিসেবে তখনকার বিজ্ঞাপনগুলোও হতো শুধুমাত্র ব্যবসার প্রসারের জন্য। সে সময় বিজ্ঞাপনগুলো তৈরী হতো পুরোপুরি ব্যবসায়ীদের পছন্দমতো। কিন্তু এক সময়ে এসে এ নিয়ম ভঙ্গ হলো। ধীরে ধীরে তারা এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারলেন যে, ব্যক্তিগত মুনাফা লাভের বাইরে সমাজ কল্যাণেও তাদের করার মতো অনেক কিছু রয়েছে। এখন তাই ব্যবসায়ীরা ভোক্তাদের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবেলায় আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
সমাজকল্যানমূলক কাজে জনমানুষের কাতারে এসে উন্নয়নের বিভিন্ন কার্যক্রমে আজ ব্যবসায়ীরা অংশ নিচ্ছেন। সরকারের বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজে তারা সহায়তা করে যাচ্ছেন। সমাজ উন্নয়নে ব্যবসায়ীদের এই অংশ গ্রহনের ফলে বিজ্ঞাপনের ভাষা যাচ্ছে পাল্টে। সনাতন বিজ্ঞাপনের ধারনাকে পাল্টে দেয়া জনসেবামূলক এই বিজ্ঞাপনকে বলা হচ্ছে সামাজিক বিজ্ঞাপন।

সামাজিক বিজ্ঞাপন
সামাজিক বিজ্ঞাপনকে বিভিন্ন সময়ে ও ক্ষেত্রে বিভিন্ন নাম দেয়া হয়েছে। যেমন: Public service, Institutional Idea, Non-product, Social Advocacy এবং Public Source বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের বিভিন্ন শাখায় সামাজিক বিজ্ঞাপন ব্যবহার হয়ে থাকে। যেমন: Public Interest Ad, Public Affair Ad, Public Service Ad, View Point Ad, Stratgic Ad, Opinion Ad, Advocacy Ad, Adversary Ad এবং Cause and issue Ad। বিভিন্ন বিজ্ঞাপন লেখক তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সামাজিক বিজ্ঞাপনের এই টার্মগুলোকে ব্যবহার করেন।
Garbett এর মতে Public Service বিজ্ঞাপন হলো, “Public Service is that kind of advertising either government or association sponsored which promotes causes and activities generally accepted as desirable”. এ ধরনের বিজ্ঞাপন সাধারনত বিতর্কিত ছাড়া প্রচারিত হতে পারে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূণ বিষয় হলো যে এ ধরনের বিজ্ঞাপন সবসময় ভালো কাজ বা জনসেবামূলক কাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকে।

বৈশিষ্ট্য
সামাজিক বিজ্ঞাপনের কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য:-
▷ Public Service বিজ্ঞাপন, Public Relations বিজ্ঞাপনের মতো। কোন পণ্য বিক্রির জন্য এ বিজ্ঞাপন দেয়া হয় না। ভোক্তার মন গলিয়ে মুনাফা লাভের জন্য এ বিজ্ঞাপন দেয়া হয় না।
▷ সামাজিক কোন বিষয় বিশেষ করে কোন সমস্যার ওপর গুরুত্ব দিয়ে সামাজিক বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়।
▷ সামাজিক, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক কোন ইস্যু নিয়ে এ ধরনের বিজ্ঞাপন করা হয়। এর মাধ্যমে মানুষের মনেযোগর আকর্ষন করা হয়। সামাজিক বিজ্ঞাপন কখনও কখনও ভাল কাজে অংশগ্রহনের জন্য মানুষকে সরাসরি উৎসাহিত করে।
▷ সাধারনত মিডিয়াতে সময় ও স্থান ব্যবহারের জন্য অর্থ ব্যয় করতে হলেও এ ধরনের বিজ্ঞাপনে কোন অর্থ গুনতে হয় না। যদি কিছু অর্থ প্রয়োজনও হয় তবে তার জন্য বিভিন্ন কোম্পানীর পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়া যায়।
▷ এ ধরনের বিজ্ঞাপনে পৃষ্ঠপোষকতায় এগিয়ে আসে সরকার। বিভিন্ন সেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান এবং কখনও কখনও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান।
▷ সমাজের বিভিন্ন ইস্যুর মধ্যে যেগুলোতে সাধারনত মানুষের আগ্রহ বেশি থাকে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে মানুষ যে ইস্যুগুলোতে সাড়া দেয়- সেসব বিষয়েই সামাজিক বিজ্ঞাপন বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
▷ সাধারনত বিতর্কিত বা বিচ্ছিন্ন বিষয় নিয়ে এ ধরনের বিজ্ঞাপন হয় না।
সামাজিক বিজ্ঞাপনের প্রয়োজনীয়তা বা উদ্দেশ্য
বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ব্যবসা, পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া, সমাজ, সংসকৃতি, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্রুত পরিবর্তন সাধিত হচ্ছ। এই পরিবর্তনের ফলে মানুষের মধ্যে নানা রকম অর্থ সামাজিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে, আর এই সমস্যা বিভিন্নভাবে অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। এর ফলে সমাজের বঞ্চিত জনগোষ্ঠী নানান সমস্যায় জর্জড়িত হচ্ছে।
সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে সরকার এসব নানান সমস্যা সমাধানে প্রভাবনকারীর ভূমিকা পালনের চেষ্টা করছে। কিন্তু নিজস্ব সীমাবদ্ধতার কারনে এসব নানান সমস্যা সমাধানে সরকার সেভাবে সফল হতে পারছে না। আর এজন্যই বিভিন্ন বেসরকারী কোম্পানী বা সংগঠন এসব সমস্যা সমাধানে সরকারকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসছে। বেসরকারী পর্যায়ে নানান সামাজিক সমস্যার নিরসনের এই কার্যক্রমকে Social Advertising বা Public Service Advertising বলা হয়ে থাকে।
প্রধানত দু’টি বড় উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বিভিন্ন বেসরকারী সংস্থা বা কর্পোরেশন সামাজিক বিজ্ঞাপনে অংশ নিয়ে থাকে।
i. Image Building
ii. Action Inducing
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের ভাবমূর্তি গঠনের জন্য এবং তাদের প্রতি জনগনের মনেযোগ আকর্ষন জন্য Social Ad দিয়ে থাকে। সমালোচকদের আবার ভিন্নমত। তাদের মতে, বিভিন্ন কোম্পানী তাদের বিভিন্ন অসৎ কর্মকান্ড ধামাচাপা দেয়ার জন্য সাধারনত সামাজিক উন্নয়নের কাজে অংশগ্রহন করে। সে প্রসঙ্গ ভিন্ন।
বর্তমান বিশ্বে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা প্রতিনিয়ত মহামারী আকার ধারন করেছে। যেমন: পরিবেশ দূষন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, এইডস, স্বাস্থ্য সমস্যা ইত্যাদি। এসব সমস্যার সমাধান এবং মানুষকে এসব বিষয়ে সচেতন করে তোলার লক্ষ্যে বিভিন্ন সংগঠন সামাজিক বিজ্ঞাপনকে অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।

সামাজিক বিজ্ঞাপনের কাজ
1. সামাজিক বিজ্ঞাপন বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করে। যেমন: সামাজিক কুসংস্কার, যৌতুক, এসিড নিক্ষেপ, মাদক প্রভৃতি বিষয়ে মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধি করে।
2. বিজ্ঞাপনদাতা প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি গঠনে সাহায্য করে।
3. সামাজিক বিজ্ঞাপন মানুষের মাঝে এক ধরনের সক্রিয়বোধ গঠনে ভূমিকা রাখে। যেমন: এসিড নিক্ষেপের বিজ্ঞাপন দেখে মানুষের মাঝে অনেক প্রতিক্রিয়া তৈরী হয়।
4. এ ধরনের বিজ্ঞাপন সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহকে চিহ্নিত করে। যেমন: টিকাদান, নিরাপদ পানি ইত্যাদি।

সামাজিক বিজ্ঞাপনে শ্রেনীবিভাগ
♠ KOTLER .PHILIP সামাজিক বিজ্ঞাপনকে ৬ ভাগেভাগ করেছেন:
এক, Political Ad
আমাদের দেশে এ ধরনের বিজ্ঞাপন তেমন নেই। কিন্তু ভারত বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের সময় এ ধরনের বিজ্ঞাপন ব্যপকভাবে দেখা যায়। যেমন: ১৯৮০ সালে মাকিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের সময় একেজন প্রার্থী একাই ২৯ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছিলেন শুধু রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের জন্য। এখানে দলের ভাবমূর্তি ফুটিয়ে তোলা হয় এবং গণতন্ত্রের কথা বলা হয়।
দুই, Social Cause Ad
সামাজিক সমস্যার প্রতি নির্দেশ করে এ ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়। যেমন: এইডস প্রতিরোধ বা শিক্ষাক্ষেত্রে সাহায্যের আবেদন ইত্যাদি।
তিন, Charitable Ad
প্রাকৃতিক দূর্যোগ যেমন: বন্যা, ঘূর্ণীঝড়, ভূমিকম্প প্রভৃতিতে মানুষকে সাহায্য করার জন্য এ ধরনের বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। সাধারনত বিজ্ঞাপনে সরাসরিভাবে সাহায্যের কথা বলা হয় না। কিন্তু এতে এমন কিছু উপাদান থাকে যা দেখে মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে সাহায্যে এগিয়ে আসে।
চার, Government Ad
সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় এ ধরনের বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়। যেমন: আর্সেনিক দূষণ, বৃক্ষরোপন, পানি বা বিদ্যুৎ অপচয়রোধ ইত্যাদি।
পাঁচ, Private Non-Profit Ad
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, নারী সংগঠন ইত্যাদি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান এ ধরনের বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। যেমন: নারী অধিকার, শিশু অধিকার সম্পর্কিত বিজ্ঞাপন।
ছয়, Association Ad
বিভিন্ন এ্যাসোসিয়েশন যেমন: আইনজীবী, শিক্ষা, ব্যবসায়ী সংগঠন এ ধরনের বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে। এসব বিজ্ঞাপনের উদ্দেশ্য থাকে মূলত বিজ্ঞাপনদাতা সংগঠনের ভাবমূর্তি গঠন এবং সংগঠনের বিবিধ কর্মকান্ড সম্পর্কে অবহিত করা।
♠ Sandage এর মতে, সামাজিক বিজ্ঞাপন ৩ ধরনের। এগুলো হলো-
1. Public Service Ad
2. Advertorials
3. Political Ad
♠ Dunn & Murbann সামাজিক বিজ্ঞাপনকে জনসংযোগ বিজ্ঞাপন বলছেন। তাদের মতে, এ বিজ্ঞাপন ৪ ধরনের হয়ে থাকে। সেগুলো হলো-
1. Institutional Ad
2. Advocacy Ad
3. Public Service Ad
4. Political Ad

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*