যোগাযোগের উপাদান । Elements of Communication

যোগাযোগের উপাদান Elements of Communication:

Taslima Erin

যোগাযোগের উপাদান


যোগাযোগের এমন কিছু উপাদান রয়েছে যা এটিকে সহজতর এবং শৃংখলাবদ্ধ করে তুলতে সক্ষম। 

Harold D. Laswell এর মতে, যোগাযোগের ৫টি উপাদান রয়েছে। এগুলো হলোঃ
১। উৎস (sender), ২।বার্তা (message), ৩।মাধ্যম (channel), ৪।প্রাপক (receiver) ও ৫।প্রভাব (effect)।


উৎস (sender):

এখানে, উৎস বলতে প্রেরক বা যোগাযোগে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক ব্যক্তিকেই বোঝায়, যিনি তাঁর ভাবনাকে অথবা ধারণাকে অন্যের নিকট প্রেরণের জন্য বার্তায় রূপদান করে এবং সেটিকে প্রাপকের নিকট প্রেরণ করে। এরপর বার্তাটি যার উদ্দেশ্যে প্রেরিত হয়েছে তিনি তা গ্রহণ করেন। আর যিনি বার্তাটিকে পরীক্ষণ করে ফলাবর্তন করে থাকেন তাকে প্রাপক বা গন্তব্য বলা হয়। এভাবেই যোগাযোগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকে। 

একটি যোগাযোগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে অবশ্যই দুটি কিংবা তার বেশী পক্ষ থাকতে হবে। অন্ততপক্ষে, একজন উৎস যিনি বার্তা প্রেরণ করবেন, বার্তাটি বোঝার জন্য একটি ভাষা এবং বার্তা গ্রহণের জন্য একজন গ্রাহক থাকতে হবে। 


বার্তা (message):

বার্তা প্রেরণের ক্ষেত্রে,
প্রথমে আমাদের প্রাপক সম্পর্কে ভাবতে হবে। তিনি কি ধরনের দলে অবস্থান করে- তাঁর পদমর্যাদা কি, তিনি কি প্রত্যাশা করতে পারেন ইত্যাদি। তাহলেই উৎসের পক্ষে বার্তাটিকে গ্রাহকের জন্য তথ্যবহুল ও প্রয়োজনীয় করে তোলা সম্ভব হবে। 

বার্তার মূলভাব স্পষ্ট হতে হবে। তাই কিছু কিছু ক্ষেত্রে উৎসকে তার শ্রোতা সম্পর্কে পূর্বেই জেনে নিতে হবে। 

উদাহরণস্বরূপ, আমাদের আত্মীয়-স্বজনের সাথে আমরা যে ধরণের আচরণ করি, আমাদের বন্ধুদের সাথে তেমন আচরণ করি না। আবার একজন ব্যক্তির সামনে যেরকম আচরণ করি, ১০০০ জনের সামনে তেমনটা করা সম্ভব হয় না। কার্যকর যোগাযোগ করতে হলে প্রথমেই অপর পক্ষকে আমাদের প্রতি বিশ্বাসী করে তুলতে হবে। আর সেজন্য বার্তাটিকে যথেষ্ট তথ্যসমৃদ্ধ করে তুলতে পারা জরুরী।


ভাষা (language) :

অপরপক্ষের নিকট বার্তা বোধগম্য করে তুলতে বার্তাটিকে একটি ভাষায় রূপ দিতে হয়। তাই বলা যায়, ভাষা কার্যকর যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যে, প্রেরিত বার্তাটি যেন গ্রাহকের মনে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব তৈরী না করে। আর সেজন্য বার্তাটিকে একটি সাধারণ ভাষায় রূপ দিতে হবে। 


মাধ্যম (channel):

বস্তুত, বার্তা একটি মাধ্যমের সাহায্যে প্রেরিত হয়। পৃথিবী বিস্তৃত হওয়ার দরূণ, যোগাযোগের মাধ্যমও বিস্তৃত। বার্তা এবং গ্রাহকের উপর ভিত্তি করে মাধ্যম নির্ধারণ করা হয়। দূরবর্তী যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমরা সাধারণত ইলেক্ট্রনিক মাধ্যম ব্যবহার করে থাকি। এধরণের মাধ্যমের সুবিধা হলো, এটি অত্যন্ত দ্রুতগামী। এটি সময় বাঁচায় এবং অধিক কার্যকরী। সাধারণত, উৎস এমন মাধ্যম বেছে নিবেন যা গ্রাহকের জন্য উপযুক্ত এবং সহজলভ্য। মাধ্যম বাছাইয়ের সময়, উৎস দেখবে তার প্রাপকের নিকট একই মাধ্যম রয়েছে কিনা। 

প্রভাব (effect):

উৎসের কোন মাধ্যম হতে, বার্তা গ্রহণ করতে প্রাপকের যেন ঝামেলা পোহাতে না হয়। এখানে উৎস বার্তাটিকে তার ভাবনায় রূপ দেন ভালোভাবে বোঝার জন্য। ফলে এখানে ভুল বোঝাবুঝির একটা আশংকা থাকে। কারণ সব বার্তারই একটা ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব থাকে। তাই বার্তার ইতিবাচক বা নেতিবাচকতার উপর কার্যকর যোগাযোগ নির্ভর করে। যেমন, আমরা বাজার থেকে যেসকল পণ্য ক্রয় করি সেগুলোর গায়ে একটি ইমেইল এড্রেস থাকে সেখানে পণ্যটির সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া জানানোর জন্য। একই প্রক্রিয়া যোগাযোগের ক্ষেত্রেও দেখা যায়।

ফলাবর্তন (feedback):

প্রাপক যখন বার্তার প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখান, তখন উৎস তার বার্তাটি ঠিকমত পৌছেছে  কিনা সেবিষয়ে নিশ্চিত হন, যা কার্যকর যোগাযোগের প্রতিনিধিত্ব করে। উৎসের বাছাইকৃত মাধ্যমের উপরই ফলাবর্তন নির্ভর করে। মুখোমুখি যোগাযোগের ক্ষেত্রে ফলাবর্তন সাথে সাথেই ঘটে। তাই প্রাপককে তার ফলাবর্তনের প্রতিক্রিয়া জানার জন্য অপেক্ষা করে থাকতে হয় না। কিন্তু কখনও কখনও এটি সময়সাপেক্ষ হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ,লিখিত যোগাযোগের সময় প্রতিক্রিয়া জানতে সময় লাগে, যেখানে মৌখিক যোগাযোগে তেমন কোন সময়ই লাগে না।

ফলাবর্তন মূলত প্রভাব। বস্তুত কিছু কিছু ফলাবর্তন দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব রাখে।আবার কিছু কিছু ফলাবর্তনের প্রভাব খুবই স্বল্প। 


পরিবেশ (context):

কিছু বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ বিষয় যেমনঃ প্রতিবন্ধকতা, পরিবেশ, চাপ ইত্যাদিও যোগাযোগে প্রভাব রাখে। উন্নত যোগাযোগের জন্য উন্নত পরিবেশ প্রয়োজন। প্রতিবন্ধকতা যোগাযোগের এমন একটি উপাদান যা অবহেলা করা যায় না। 

গার্বনারের সাধারণ মডেল তত্ত্বে বলা হয়, বাস্তব জীবনে সংঘটিত সকল ঘটনা হতে একজন ব্যক্তি সব বার্তা গ্রহণ করতে পারে না। ব্যক্তি তার ইচ্ছামত পরিবেশ বেছে নেয় এবং সে অনুযায়ী বার্তা গ্রহণ করে। তাই উৎস হতে প্রেরিত সকল বার্তাই প্রাপক গ্রহণ করে না। সে কেবল ওয়ি সকল বার্তাই গ্রহণ করে যেগুলো সে বোঝে বা যেগুলোর প্রতি সে আকৃষ্ট হয়। 
উদাহরণস্বরূপ, একজন সাংবাদিক কোন ঘটনার সকল দিকের প্রতি নির্দেশ দেন না বা এর সবটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন না। তাই তিনি সেটি ছাকন বা পরিশোধনের মাধ্যমে এর অপ্রয়োজনীয় বা অপ্রাসঙ্গিক বিষয় বাদ দেন। লিখিত সংবাদটি প্রকৃত ঘটনার সাথে পুরোপুরি মেলে না। কেননা সাংবাদিক তার ব্যক্তিত্ত্ব, মেজাজ, সংস্কৃতি ও পত্রিকার নীতি অনুসরণ করে তা সম্পাদনা করেন। 

এইসকল প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আমরা কারও সাথে যোগাযোগ করে থাকি, একে অপরকে বুঝতে পারি। যখনই আমরা কারও সাথে যোগাযোগ করি, সেখান থেকে আমরা কিছু জ্ঞান অর্জন করি। যা আমরা আমাদের পরবর্তী যোগাযোগের ক্ষেত্রে কাজে লাগাই। যোগাযোগ এমন একটি প্রক্রিয়া যা কারও অগোচরে বা নিয়ন্ত্রণে থাকে না। আমাদের জীবনের প্রতিটি চলার ক্ষেত্রেই আমরা অন্যের সাথে যোগাযোগ করে থাকি।

কেবল মানুষই যোগাযোগ করে এমন নয়। পশুপাখি, প্রাণি, ইত্যাদিও যোগাযোগ করে। তবে তাদের যোগাযোগের সাথে মানুষের যোগাযোগের পার্থক্য রয়েছে। মানুষ ও অন্যান্য প্রাণিকূল একে অপরের যোগাযোগ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করতে পারে না। 


উপসংহার (conclusion):

উৎস (sender) হতে বার্তা (message) প্রাপকের (receiver) কাছে পৌঁছাতে কতগুলো ধাপ অতিক্রম করতে হয়। পূর্ন বার্তাটি গ্রাহকের কাছে পৌছাতে হবে এবং সেটি গ্রাহকের নিকট বোধগম্য হতে হবে। যোগাযোগ প্রক্রিয়াটি তখনই কার্যকর হবে যখন এখানে ইতিবাচকতা লক্ষ্য করা যাবে। বর্তমান বিশ্বের প্রতিটি আনাচে কানাচে যোগাযোগ বিদ্যমান। টেকনোলজি এই যোগাযোগকে সফল করতে বিরাট ভূমিকা পালন করছে। এটি যোগাযোগ প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুতগামী ও সহজতর করে তুলেছে। এটি একাধিক মাধ্যম ও মিডিয়ার সাহায্যে যোগাযোগ প্রক্রিয়ার বাধাসমূহকে অতিক্রম করতে সাহায্য করছে।

Know more …

https://www.communicationstudies.com/knowledge-base

https://www.communicationtheory.org/category/communication

লেখক : শিক্ষার্থী

৪র্থ বর্ষ (২২ তম ব্যাচ)

যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*