মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সংবাদের উপর বিজ্ঞাপন দাতাদের প্রভাব। cajbd.com

মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সংবাদের উপর বিজ্ঞাপন দাতাদের প্রভাব

মিডিয়ার মালিকানা ও ভূমিকা:

মিডিয়া গবেষক রবার্ট ডব্লিউ ম্যাকচেজানি ১৯৯৭ সালে বলেন, একটা ভূত এখন সারা পৃথিবীকে তাড়া করছে; ক্ষুদ্র সংখ্যক মহাক্ষমতাধর বহুজাতিক মিডিয়া কর্পোরেশনের অধিপত্যাধীন, যার অধিকাংশই যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক, বৈশিক বাণিজ্যিক মিডিয়া সিস্টেম। এটি এমন একটা সিস্টেম যা বৈশিক বাজার গড়ে তুলতে ও বাণিজ্যিক মূল্যবোধ প্রমোট করতে কাজ করে এবং একই সাথে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি কর্পোরেট স্বার্থের প্রতিকূল সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতির আনয়ন ঘটায়।

মিডিয়া কোম্পানিগুলো কর্পোরেশনগুলোর যৌথ উৎপাদনের ফলে বাজারে কোন প্রতিযোগিতা থাকে না এবং তাদের মুনাফা অর্জন হয় নির্বিঘ্ন, প্রভাবও পরে একচেটিয়া। ম্যাকচেজনি বলেন, পৃথিবীর বেশীরভাগ চলচ্চিত্র, টিভি-শো, কেবল চ্যানেল মালিকানা, কেবল ও স্যাটালাইট ব্যবস্থার মালিকানা, বই প্রকাশনা, ম্যাগাজিন প্রকাশনা, সংগীত শিল্প পঞ্চাশটির মতো ফার্মের নিয়ন্ত্রনে এবং প্রথম স্তরের নয়টি ফার্ম এই সকল ক্ষেত্রেই আধিপত্য করে। গনতন্ত্রের যেকোন মানদন্ডেই এই পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। এসব অধিপতি মিডিয়ার আকার ও আর্থিক সামর্থ বাড়ার সাথে সাথেই, ক্ষুদ্র মিডিয়া গুলোকে কিনে নিতে বা নিঃশেষ করে দিতে, তাদের দমন-পীড়নও বেড়ে গিয়েছে।

বৈশ্বিক মিডিয়ার সাথে সবটুকু না মিললেও আমরা দেখি , বৃহৎ পুজিঁর মালিকরাই মিডিয়া ব্যবসায় নামে। যেমন: বাংলাদেশের প্রধান দুইটি দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলো ও যুগান্তর যথাক্রমে ট্রান্সকম লিমিটেড যমুনা গ্রূপের মালিকানাধীন। তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থই এক্ষেত্রে প্রাধান্য পায়, তারা যে মূল্যবোধের প্রসার ঘটায় তা বৈশ্বিক অধিপতি মিডিয়াগুলোর পক্ষেই চলে যায়।

মোটকথা আধিপত্যশীল মিডিয়া সংস্থাগুলো অনেক বড় আকারের ব্যবসায়ই ধনী ব্যক্তিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় এবং কিংবা ব্যবস্থাপকরা নিয়নত্রন করে। এই মিডিয়া গুলো ঘনিষ্ঠভাবে আন্তঃসম্পর্কিত এবং অন্যান্য প্রধান কর্পোরেশন, ব্যাংক ও সরকারের সাথে তাদের গুরুত্বপূর্ন স্বার্থগত সম্পর্ক রয়েছে। এটা সংবাদ বাছাইকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। সাম্প্রতিক উদাহরন দিলে আমরা বলতে পারি, গত ৫ই জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনকে ঘিরে মিডিয়ার কার্যকর ভূমিকা মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচন পরবর্তী বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর স্বীকৃতির পর মিডিয়া সেটাকে জায়েজ করে নেয়। এক্ষেত্রে অনেক বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে পারতো, যা গনতন্ত্রের পথকে আরো মসৃন করতো কিন্তু মিডিয়ার মালিকানা এবং স্বার্থগত বিষয় এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

মিডিয়ার সাথে বিজ্ঞাপনের সম্পর্ক:

মিডিয়ার সাথে বিজ্ঞাপনের সম্পর্ক মা-বাপের সম্পর্কের মত। ম্যাকচেজানি মনে করেন, বৈশ্বিক মিডিয়া বাজার গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ইন্ধন যুগিয়েছে বৈশ্বিকভাবে বিজ্ঞাপনের প্রসার। ফার্মের স্বার্থরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বিজ্ঞাপন। ১৯৯৫ সালের পৃথিবীর আটটি বৃহৎ বিজ্ঞাপনদাতা গোষ্ঠী তাদের মোট ব্যয় ৩০০ বিলিয়ন থেকে সারা বিশ্বে কেবল বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য খরচ করে ২৫ বিলিয়ন ডলার।

বিজ্ঞাপন দাতারাই মিডিয়ার প্রকৃত কাস্টমার। টার্গেট অডিয়ান্সকে লক্ষ্যকরেই টিভি স্টেশনগুলো তাদের অনুষ্ঠান মালা সংবাদ প্রচার করে, যাদেরকে বিজ্ঞাপনদাতারা পছন্দ করে। এদেশের ক্রিকেটকে জনপ্রিয় করে তুলেছে মিডিয়া, কারন ক্রিকেটের সাথেই বেশী বিজ্ঞাপন যায়।

অধিপতি মিডিয়া অডিয়েন্সের কাছে বিপনন বার্তা প্রচারের মাধ্যম। এই অডিয়েন্স হলো সমাজের উচুঁতলার অডিয়েন্স; যাদেরকে মিডিয়া আপামর জনগন বলে চালিয়ে দেয়।

সংবাদ মানে ক্ষমতাশালীদের সংবাদ:

মিডিয়া সমাজের উচ্চবৃত্ত তথা ক্ষমতাশালী শ্রেনীর প্রতিনিধিত্ব করে। ১৯৯২ সালে মারকুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের করা এক জরিপে দেখা গেছে ইংল্যান্ডের সম্পদকদের ৯৩ শতাংশ বলেন যে, বিজ্ঞাপনদাতারা তাদের সংবাদকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন। দারিদ্যের দুর্বৃত্বায়ন নিয়ে পিটার গোল্ডিং ও সু মিডিলটন দীর্ঘদিন ধরে গবেষনা করে দেখিয়েছেন, “কল্যানমূলক পুঁজিবাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো যে, তা দারিদ্রের কখকখ কারন ও হালচাল প্রায় সম্পূর্ন ভেঙ্গে দেয়।

আমাদের দেশে দেখি রাস্তার সহিংসতার সংবাদ নিয়ে বিপুল কভারেজ দেয় মিডিয়া। কিন্তু ক্ষমতাশীলদের সহিংসতা কিংবা কর্পোরেট সহিংসতা খুব একটা ছাপা হয়না। কৌশলে এড়িয়ে যায়। শোষিত গার্মেন্টস কর্মীরা আগুনে পুড়লে মিডিয়া মানুষের আবেগের জায়গাগুলো পুঁজি করে ব্যবসা করে কিন্তু মালিকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কেমন যেন নিরব থাকে।

মিডিয়ার বিরাজনীতিকরন:

মিডিয়ার আসল উদ্দেশ্য মুনাফা অর্জন। রাজনীতি মিডিয়ার খুব একটা ভালো লাগে না। গনতন্ত্রের আড়ালে সৈরতন্ত্র থাকলেও মিডিয়ার কিছু যায় আসে না। ধনী-দরিদ্র্যের ব্যবধান সৃষ্টি করতে পারলেই ব্যপক পুঁজির মালিক হওয়া যায়। জনগনকে রাজনীতি থেকে দূরে ঠেলে দিয়ে শাসক শ্রেনীর অর্থনীতিকে যা ইচ্ছা তাই করছে। ম্যাকচেজনি বলেন, অর্থনীতি যতটুকু বিরাজনৈতিক করে তোলা যায়।

মিডিয়ার কাঠমো কতটা গনতান্ত্রিক:

মিডিয়া মালিকদের ইচ্ছে-অনিচ্ছে মূল বিবেচ্য বিষয়। মিডিয়াগুলোতে কর্পোরেট অধিপত্য বেড়ে যাওয়ার অভ্যন্তরীন ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা আরও সংকুচিত হয়ে পড়েছে। মিডিয়া সাংবাধিনিক সুরক্ষার মাধ্যমে বাক ও ‘প্রেসের স্বাধীনতা’ ভোগ করে কিন্তু একই রকম স্বাধীনতা কর্মচারীদের দেয় না যা আদৌ গনতান্ত্রিক নয়।

মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সাংবাদিকতা:

মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন, প্রচার-প্রসার হয় ইন্টারনেটের মাধ্যমে। ইন্টারনেটের কৃতিত্ব মার্কিন জনগনের পয়সায়-প্রচেষ্টায় পরিচালিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও পেন্টাগনের। কিন্তু ইন্টারনেট এখন কর্পোরেট পুঁজির হাতের মোয়া এবং ইন্টারনেটকে ঘিরে একটি বিশাল বাজার তৈরী হয়েছে।

তবুও ইন্টারনেট এ কালের জনগনের সাহিত্য, সাংবাদিকতা এবং এই কালের কন্ঠস্বর। তৈরী হয়েছে নতুন সুযোগ। লড়াইয়ের নতুন চেহারা। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সাংবাদিকতা দিন দিন বিকাশিত হচ্ছে।

সাংবাদিকতা শিক্ষার কাঠামো শাসক শ্রেনীর প্রতিনিধিত্ব তৈরী করে:

সাংবাদিকরা মালিকের গোলাম মাত্র। মজুরীভোগী গোলাম। সংবাদপত্র ঠিকই একটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। মালিক পক্ষ দেখে শুনে কর্মচারী করেন নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। সাংবাদিকরা যেমন মালিকের কাছে দায়বদ্ধ তেমনি মিডিয়া মালিকরা ও তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ টিকিয়ে রাখতে শাসক শ্রেনীর সাথে ‘গভীর সম্পর্ক’ জালে আবদ্ধ। সেই অর্থে মালিকরা শাসকশ্রেনীরই প্রতিনিধিত্ব করে।

সচেতনতার প্রসঙ্গে ‘হীরকরাজার দেশে’ চলচ্চিত্রের কথা দিয়ে শেষ করা যায়। যেখানে মস্তিস্ক প্রক্ষালন যন্ত্রের প্রভাবে সবাই বলে, “দড়ি ধরে মারো টান, রাজা হবে খান খান”।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*