1stYearBasicConcepts of Communication

মানবীয় যোগাযোগ এর উদ্ভব ও বিকাশ | Origin And Development of Human Communication

পল্লী মজুমদার

মানবীয় যোগাযোগ এর উদ্ভব ও বিকাশ Origin And Development of Human Communication

যোগাযোগ মানব জীবনের অন্যতম অংশ। আমরা যোগাযোগেই ডুবে থাকি সারাক্ষন। আমরা সচেতন বা অবচেতন যে অবস্থায় থাকি না কেন সবসময়ই যোগাযোগের মধ্যে থাকি। তবে স্থান, কাল, পাত্র ভেদে আমাদের যোগাযোগ ভিন্ন হয়ে থাকে। আমরা যোগাযোগের সাথে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা।

যোগাযোগ সাধারণত তথ্যের আদান-প্রদানকে বোঝায়। আরো সাধারণ যদি বলা হয়, তবে কাউকে কিছু বলাই হলো যোগাযোগ। কিন্তুশুধু মাত্র কী কথা বলাই যোগাযোগ? তা নয়, যোগাযোগ নানা ভাবে হয়ে থাকে। যেমন, চিন্তার মাধ্যমে নিজের সাথে যোগাযোগ, কোন লেখা বা সংকেত এর সাহায্যে কাউকে কিছু জানানোর মাধ্যমে ইত্যদি। এখন প্রশ্ন আসতে পারে যোগাযোগ কী শুরু থেকেই একরকম নাকি যুগের সাথে যোগাযোগেও পরিবর্তন এসেছে? অবশ্যই এসেছে। পৃথিবীতে সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে যোগাযোগেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। যোগাযোগের পরিবর্তনকে আমরা কালানুসারে বিভক্ত করতে পারি। যেমনঃ

সৃষ্টির শুরুঃ

“The world is very old, and human bings are very young”- Carl Sagan. সত্যিই তাই। যোগাযোগের প্রাচীন যে নির্দশন পাওয়া যায় তা হলো গুহা চিত্র, যা মহাবিশ্বের সৃষ্টির ইতিহাসের তুলনায় বড়ই নবীন। পৃথিবীতে মানুষের আগে ছিলো গাছ-পালা, প্রাগৈতিহাসিক সরীসৃপ বা ডাইনোসর ইত্যাদি। আর মাত্র ১০ লক্ষ বছর আগে সৃষ্টি হয় মানব জাতির। আর মানুষের হাত ধরে আসে যোগাযোগ।

শুরুর দুকের মানুষের খুব বেশি নির্দশন পাওয়া যায় নি। যা পাওয়া যায় তা হলো ফসিল(Fossils)বা জীবাশ্ম, তাদের ব্যবহহৃত কিছু ক্ষুদ্র সমতল পাথর।সে সময় যোগাযোগের উদ্দেশ্য ছিলো শিকার করা, খোঁজা, দুর্যোগ মোকাবিলা করা।

সে সময়ের মানুষের কন্ঠোচ্চারিত যোগাযোগের বেশিরভাগ ছিলো পশুর ডাক। তবে সে সময় অবাচনিক যোগাযোগই বেশি হত। সে সময় পৃথিবীতে মানুষে সংখ্যা এখনকার  এত বেশি ছিলো না। শিকারের সন্ধানে তারা নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াত, তাই তারা কোথাও  থিতু হতে পারে নি আর না পেরেছে সভ্যতা গড়ে তুলতে। সে সময় বেবুনে সংখ্যা ছিল মানুষের তুলনায় ৫০ গুণ বেশি। সে সময় মানুষের প্রকৃতিতে কিভাবে টিকে থাকতে হয় তা শেখার সময় ছিলো। নৃতাত্ত্বিকরা ঐ সময় এর নাম দিয়েছেন “ প্লায়স্টোসিন” যুগ।

যোগাযোগের প্রাচীনতম যে নির্দশন পাওয়া যায় তা হলো গুহার দেয়ালে আঁকা চিত্র। আজ থেকে প্রায় ১৫,০০০ বছর আগে এসব চিত্র আঁকা হয়েছিল। ফ্রান্সের দক্ষিণ পার্বত্য অঞ্চলে Vezere নদীর উপকূলে Lascaux নামক স্থানে প্রায় ২০০ এর বেশি গুহায় এসব চিত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। Spain এর Cantabrian পর্বতমালার Altamira’য় রয়েছে একটি গুহাচিত্র, যা মানবীয় যোগাযোগ এর প্রাচীনতম নির্দশন হিসেব হয়। গবেষকরা ধারণা করেন এসব চিত্রের মূল উদ্দেশ্য ছিল যাদু টোনা। সে সময়ের মানুষ বিশ্বাস করত কোন পশুর চিত্র আঁকা হলে তা শিকার করা সহজ হবে। এভাবে তারা আত্মবিশ্বাস অর্জন করত।

ভাষার জন্মঃ

পশুর ডাকের জায়গায় বাচনিক যোগাযোগ স্থান করতে বহু সময় আতিবাহিত হয়। মানুষ সহজবোধ্য ইশারার ব্যবহার শেখে। তারপর শেখে পাথরের ব্যবহার করে পথের নিশানা তৈরী করা। মানবীয় যোগাযোগ এর ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবজনক অর্জন ছিল ভাষার ব্যবহার। এজন্যই হয়ত Julian Huxley বলেছেন-“ The evolution of verbal concepts opened the door to all further achivements of man’s thoughts.”

প্রশ্ন হতে পারে, মানুষ কেন ক্রমে বাচনিক ভাষাকে যোগাযোগের বাহন হিসেবে বেছে নিয়েছে? এর সম্ভাব্য উত্তর হতে পারে ভাষার জটিল ও বিমূর্ত বিষয় গুলোকে অবাচনিক মাধ্যম হতে বাচনিক মাধ্যমে শেখা সহজ ছিলো। এছাড়াও আন্তঃসাংস্কৃতিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইশারা ফল্প্রসু ছিলো না।

 ভাষার সৃষ্টি কীভাবে হয়েছিল এই প্রশ্নের উত্তর আজও পাওয়া যায় নি। তবে ভাষার উত্তপত্তি সম্পর্কিত কিছু তত্ত্ব রয়েছে। যেমন – “বাউ –আউ” তত্ত্ব। এই তত্ত্ব অনুসারে মানুষ জীবজন্তুর ডাক অনুকরণ করে ভাষার দিকে এগিয়ে ছিলো।

ভাষা নিয়ে প্রচলিত সব তত্ত্বে যে প্রশ্নগুলো আসে তা হলো, অন্য প্রাণী নয় শুধুমাত্র মানুষই কীভাবে পশুসুলাভ উচ্চারণকে নাম ও প্রতীকে রুপান্তর করলো? কীভাবে তারা ধ্বনির একটি ব্যবস্থা তৈরীর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল? তবে একথা নিশ্চিত যে, মানুষ ভাষা শেখার ক্ষমতা নিয়েই জন্মায়।

Know More…যোগাযোগ কি? বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে যোগাযোগের সংজ্ঞা

মানবীয় যোগাযোগ

লিখন পদ্ধতির জন্মঃ

যোগাযোগের ইতিহাসে লিখনের উদ্ভাবনকে মাইলফলক বলা যায়। লেখা আবিষ্কার হওয়ার ফলেই আমরা প্রাচীন ইতিহাস জানতে পারি। পূর্বপূরুষদের কথা জানতে পারি, তাদের সমাজ, সংস্কৃতি, পরিবেশ সম্বন্ধীয় ধারণা পাই।

লিখন পদ্ধতির আবির্ভাব চিত্র থেকেই হয়েছে। প্রায় ৩৫০০ খ্রীস্টপূর্বে আসিরীয়রা প্রথম উন্নত লিখন পদ্ধতি প্রচলন করে। তারা কাদামাটির ব্লক তৈরী করে লেখার কাজটি করত। এই পদ্ধতির নাম কিউনিফর্ম। এর চারশ’ বছর পর মিশরে হায়ারোগ্লিফসের ব্যবহার শুরু হয়।চিত্রের মাধ্যমে লিখন পদ্ধতির এই দুটি ছিলো সবচেয়ে বিখ্যাত।

১৫৫০ খ্রি. পূর্বাব্দের মধ্যে ফিনিশীয়, হিব্রু এবং ক্যানানাইটদের মধ্যে অক্ষর সমৃদ্ধ লিখন পদ্ধতি ব্যবহারের প্রমান পাওয়া যায়। এর সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিক ছিল অপেক্ষাকৃত কম সংকেতের সাহায্যে পুরো ভাষাটিকে লেখা যেত। এইভাবেই কালের বিবর্তনে আধুনিক লিখন পদ্ধতি এসেছে।

লিখন পদ্ধতি এসেছে বলেই অতিতের সাথে আমাদের যোগাযোগ তৈরি হয়েছে। নতুবা আমরা কখনোই পৃথিবীর আদি সভ্যতা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে পারতাম না।

পৃথিবীর বিভিন্ন সভ্যতায় যোগাযোগ

কোন জাতির সম্পূর্ণা জীবনকেই সভ্যতা বলে বিবেচনা করা হয়, বিশেষ করে উচ্চ স্তরের সংস্কৃতিসম্পন্ন জাতির। প্রাচীন সভ্যতা গুলোয় যোগাযোগের রুপ দেখা যাক-

 মিশরীয় সভ্যতাঃ

প্রায় ৩০০০ খ্রি.পূর্বাব্দে নীল নদের তীরে গড়ে উঠে মিশরীয় সভ্যতা। মিশরের শাসকদের বলা হত ফারাও। তারা বুঝতে পারে রাজ কার্জের জন্য শুধু মুখের ভাষা যথেষ্ট নয়, তাই তারা হায়রোগ্লিফস পদ্ধতি বের করে। তখন দুই ধরনের হায়রোগ্লিফস ছিলো ক্লাসিক ও ডেমোটিক। পুরো মিশরে এগুলো যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হত। তবে মিশর সভ্যতায় যোগাযোগ একরফা ছিলো।

মেসোপটেমিয়াঃ

ব্যবিলনীয় ও আসিরীয় সভ্যতা মিলে তৈরী হয়ে ছিলো মেসোপটেমিয়া। এই সভ্যতার সবচে প্রসিদ্ধ ব্যক্তি Hummurabi।তিনিই ইতিহাসের প্রথম আইন প্রণেতা।

চৈনিক সভ্যতাঃ

চীনা ভাষা ও লিখনের বিবর্তন অন্যান্য  জাতি হতে আলাদা। বলা হয় তাদের ভাষার বিবর্তন এক পর্যায় থেমে যায়, যার ফলে অন্যান্য ভাষায় বর্ণের সংখ্যা সীমিত তাদের হাজার হাজার সংকেত। তবে সাংস্কৃতিক ভাবে তারা উন্নত ছিলো।

গ্রিক সভ্যতাঃ

এই সভ্যতাকে নবীন সভ্যতা বলা হয়। যদিও তাদের লিখন পদ্ধতি ফিনিশীয়দের কাছ থেকে ধার করা তবুও তারাই প্রথাম স্বরবর্ণের প্রচলন ঘটায়।

তারাই উন্নত নগর সভ্যতার প্রচলক। তারা রাজনীতি, আইন, জ্যামিতি সব দিক দিয়ে এগিয়ে ছিলো। নাগরিকের রাজনীতে অংশ গ্রহন এই সভ্যতার হাত ধরে হয়। তাদের সময় স্কুল প্রথার চালু হয়। তাই বলা যায় আধুনিক সভ্যতা ও যোগাযোগে গ্রিস দের অবদান অন্যতম।

রোমান সভ্যতাঃ

রোমান সভ্যতা গড়ে উঠার পিছনে গ্রিসদের ও অবদান আছে। ভাষা ও বর্ণমালা তারা গ্রিসদের কাছ থেকে ধার নিয়েছিলো। রোমানরা ছিলো যুদ্ধবাজ। তবে তারা যেখানেই যুদ্ধকরেছে সেখানেই বর্ণমালা ছড়িয়ে পড়েছে। এবং সংবাদ প্রচার এর প্রচলন তারাই প্রথম করে।

৪৭৬ খ্রি. তে রোম Ostrogathদের দখলে চলে যায়। তখন রাজনৈতিক অস্থিরতা চালু হয়। চার্চ এবং পোপের ক্ষমতা লাভ এই থেকে শুরু। তাই তখন শুধু ধর্মীয় শিক্ষা চর্চা হত।

মধ্যযুগের শেষ ভাগে শুরু হয় বিশ্ববিদ্যলয় তৈরি। ফ্রান্সে শুরু হয় ইনস্টিটিউট প্রথা। তারপর শিল্প বিপ্লবের হাত ধরে যোগাযোগ আরো এগিয়ে যায়।

শিল্প বিপ্লবের ফলে মুদ্রণ যন্ত্র আবিষ্কার হয়। যার ফলে বই পত্রের সংখ্যা বেড়ে যায়। বই পত্র বেচা- কেনা শুরু হয় । লাইব্রেরি তৈরি হয়। এইভাবে উনিশ শতকের মাঝামাঝি পশ্চিমা বিশ্ব থেকে  নিরক্ষরতা দূর হয়। তাদের হাত ধরে বই পুস্তকের প্রচলন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।

মানবীয় যোগাযোগ

গণমাধ্যমঃ

উনিশ ও বিশ শতকে মুদ্রণের পাশাপাশি ইলেকট্রনিকস ও আলোকচিত্রে ব্যপক উন্নয়ন হয়। ফলে নতুন যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি হয় আর তা হল গনমাধ্যম ।

গনমাধ্যমের শুরু সংবাদপত্র দিয়ে। গনমাধ্যমের কল্যাণে সর্বস্তরের মানুষ সব ধরণের সংবাদ পেতে থাকে। তার পর ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া আসার ফলে মানবীয় যোগাযোগ ক্ষেত্র আরো বৃদ্ধি পায়।

১৮৩৭ সালে টেলিগ্রাফ মেশিন, ১৯১৫ সালে টেলিফোন যোগাযোগকে আরো সহজতর করে তোলে। মানুষের একে অন্যের সাথে যোগাযোগ ব্যপক হারে বৃদ্ধি পায়। তারপর একে একে আসে কম্পিউটার, স্যাটেলাইট যা যোগাযোগ কে নিয়ে গেছে অন্যমাত্রায়।

মানুষ মাত্রই যোগাযোগকারী। যোগাযোগ সবসময়ই ছিল, শুধু কালের বিবর্তনে তার মাত্রায় ভিন্নতা যোগ হয়েছে।

লেখক : শিক্ষার্থী

১ম বর্ষ ( ২৫ তম ব্যাচ)

যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Comment here