দারিদ্র্য ও অন্যায্যতা । বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

নুসরাত জাহান শোভা:

দারিদ্র্য ও অন্যায্যতা  বাংলাদেশ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট


১.
‘দারিদ্র্য’ শব্দটির কথা শুনলে মনে হয় যেনো ‘দরদ’ শব্দটির সাথে সম্পর্কিত।খুব মিল আছে এই ‘দারিদ্র্য’ ও ‘দরদ’ শব্দের মধ্যে। ‘দরদ’ শব্দটি যদিও লেখার সময় তেমন ব্যবহৃত হয় না। শব্দটির মধ্যে অন্তর্নিহিত অর্থটি যদি লিখতে হয় তাহলে হয়তো আমরা ‘করুণা’ শব্দটি ব্যবহার করবো ;

‘সহানুভূতি’ শব্দটিও প্রযোজ্য হতে পারে। ‘করুণা’ কাদের করা হয়? যারা ‘করুণ’ তাদের। করুণ পরিস্থিতিতে যার জীবন অতিবাহিত হয় তার জন্যই আমাদের ‘করুণা’ হয়। তবে কোন ব্যক্তির অসহায় অবস্থা দেখে আমাদের শুধু ‘করুণা’ ই হয়; ‘দরদ’ ই হয়; আবার ‘সহানুভূতি ‘ ও হতে পারে। কিন্তু তার সমস্যা সমাধানের চেষ্টা আমাদের মধ্যে থাকে না, আসলে থাকতে নেই। কারণ, মানুষ ‘দারিদ্র্য’ শব্দটিকে বক্তৃতা দেয়ার সময়, লিখার সময়, আলোচনার সময় আবেগ দিয়ে উপস্থাপন করলেও অন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগের সময় ‘দারিদ্র্য’ শব্দটির মানে কিন্তু নেতিবাচক ও নিকৃষ্টরূপেই উপস্থাপন করে।
মানুষ মনে করে ‘দারিদ্র্য’ কখনই কাম্য নয়। কারণ, দারিদ্র্য মানেই ঘৃণ্য কিছু। কিন্তু দারিদ্র্যকে ঘৃণা করতে গিয়ে মানুষ আসলে ঘৃণা করে সেইসব মানুষদের ই যারা ‘দারিদ্র্য’ নামক দানবের আঘাতে জর্জরিত। তাই কেউ চায় না নিজের সাথে ‘দারিদ্র্য’ প্রত্যয়টি গ্রহণ করতে। আবার এটাও চায় না যে, সমাজের যেই মানুষের সাথে এই প্রত্যয়টি যুক্ত আছে তারা যেনো সেটা থেকে বেরিয়ে এসে তার কাতারে দাঁড়াতে পারে।
কারণ,নিজেকে বড়ো করতে হলে কারো প্রতি করুণা করা খুব দরকার । 

‘তোমাকে আমি করুণা করি’ মানে সমাজে তোমার চেয়ে আমার অবস্থান অনেক উপরে।

‘দারিদ্র্য’ শব্দটি চিন্তাভাবনায়, জীবনধারণে, মানসিকতায় এই ধরনের আরও শব্দের সাথেই প্রাসঙ্গিক ভাবে ব্যবহৃত হতে পারে।কারো চিন্তাভাবনা, মানসিকতায় দারিদ্র্য প্রকাশ পায় আবার কারো অর্থনৈতিক অবস্থার দারিদ্র্য প্রকাশ পায়। অর্থনৈতিক ভাবে দারিদ্র্যের অন্যতম প্রধান প্রভাবকই হলো চিন্তাভাবনা ও মানসিকতায় দারিদ্র্য।



বাংলাদেশের মত উন্নয়নশীল একটি দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে যেসব প্রবাসী দিনরাত আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে, মাতৃভূমি থেকে দূরে গিয়ে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে, বিদেশে যাওয়া কিংবা আসার সময় বিমানবন্দরে তথাকথিত শিক্ষিত কর্মচারীদের চোখে সমাজে নিজেদের অবস্থানের যে ইঙ্গিত পায় সেটাতো সেই কর্মচারীদের মানসিক দারিদ্র্যের ই বহিঃপ্রকাশ।

এই মানসিক দারিদ্র‍্যকেই বেগম রোকেয়া তাঁর ‘চাষার দুক্ষু’ প্রবন্ধে অনেকাংশে তুলে ধরেছেন। এই দারিদ্র্য আমাদের শিক্ষিত সমাজে আরও ভয়ানকভাবে উপলব্ধি করা যায়।

“দারিদ্র্য হলো এমন একটি অর্থনৈতিক অবস্থা, যখন একজন মানুষের জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান অর্জন এবং সামান্য আয়ের ফলে জীবনধারণের অপরিহার্য দ্রব্যাদি ক্রয় করার সক্ষমতা হারায়”- উইকিপিডিয়া

এই সংগাটি দেখলে একটা প্রশ্ন মাথায় আসে যে, একজন মানুষ কোন কারণে জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান অর্জন করতে পারে না? দেখা যায়, যারা এই জীবনযাত্রার ন্যূনতম মান অর্জন করতে পারে না তাদের একটি বিরাট অংশই হলো শ্রমিকশ্রেণি। ‘শ্রমিক’ যারা একটি দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখে তারাই দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী নাগরিক। অথচ বিনিয়োগকারী, চাকরিজীবী কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের চেয়ে কম অবদান রাখার পরেও নিজেদেরকে সমাজের উচ্চ পর্যায়ে আসীন ও ভোগবিলাসের জীবন অতিবাহিত করতে পারে কিভাবে? আর সমাজের উঁচু আসনে বসে ঘৃণার চোখেই বা কেনো দেখে তাদেরকে যারা উঁচু আসনে বসায় সেই সব মানুষদের।

২.
‘অন্যায্যতা’ কথাটি হয়ত এইসব প্রশ্নের উত্তর হিসেবে যথার্থ। ‘ন্যায্য’ কথাটির মানে হলো যথার্থতা। ব্যক্তি যতটুকু কাজ করবে ততটুকুই সে লাভ করবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষাপটে যারা কাজ করে তারা সমাজের নিচু শ্রেণি। আর যারা বসে বসে আদেশ দেয় তারাই উঁচুশ্রেণি। তারাই আবার নিচুশ্রেণির কাজের ফলও ভোগ করে।



দারিদ্র্য ও অন্যায্যতা এই অর্থনৈতিক ফল বা সম্পদ বণ্টনের প্রক্রিয়াকে অন্যায্যতা বলা যেতে পারে। তাই দিনরাত পরিশ্রম করেও ‘অন্যায্যতা’ নামক দানবের কাছে হেরে গিয়ে নিচুশ্রেণি নিজেদের দারিদ্র্যের শিকল পরায়। দারিদ্র্যের মতই অন্যায্যতা কথাটি অর্থনৈতিক ও চিন্তাভাবনা, মানসিকতার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য।

মানুষের এই সমাজে যারা বাড়ি তৈরি করে তারা থাকার জন্য বাড়ি পায় না, যারা রিক্সা চালায় তারা রিক্সা চড়ে না, যারা কাপড় বানায় তারা পড়ার জন্য কাপড় পায় না। উপরন্তু আমাদের সমাজের দারিদ্র্যমুক্ত শ্রেণি তাদের ন্যায্য সম্মানটুকুও করতে জানে না। ‘ব্যক্তিকে ন্যায্য সম্মান দেয়া উচিত’ । অর্থাৎ, ব্যক্তির যতটুকু সম্মান প্রাপ্য তাকে তা দেয়া উচিত।আমাদের সমাজের ভিত গড়ার জন্য যেই শ্রমিক শ্রেণি কাজ করে তাদের অর্থনৈতিক অধিকার তো দূরের কথা, ন্যায্য সম্মানের চোখেও দেখা হয় না। এ হলো দারিদ্র‍্যসীমায় বসবাসকারী মানুষদেরকে প্রাপ্য সম্মানটুকু দেয়ার ক্ষেত্রে অন্যায্যতা।

বিগ ব্যাঙ তত্ত্বানুসারে, সময়ের শুরু ১৫’শ কোটি বছর আগে। ৪ থেকে ৫ শ’ কোটি বছর আগে পৃথিবীতে সৃষ্টি হয় মানুষের।(তথ্যসূত্রঃ যোগাযোগের ধারণা)

তাহলে এই কয়েক লক্ষ বছরেই মানুষ কিভাবে নিজের স্তরের মানুষ কে পরিণত করল দাসে? কিভাবে কিছু মানুষ অতি উচ্চমানের জীবনযাপন করে আবার কিছু মানুষ ন্যূনতম জীবনযাত্রার মান অর্জন করতে পারে না? মানুষ সৃষ্টির শুরুতে যেমন কোন ভাষা ছিল না ঠিক তেমনই ‘দারিদ্র‍্য’ নামক শব্দটিও ছিল না। জীবনধারণের প্রয়োজনে আদিম মানুষ দলবদ্ধভাবে বসবাস করতো। ধীরে ধীরে আগুনের ব্যবহার শেখার পর তারা চাষাবাদেও পারদর্শী হয়ে উঠতে থাকে। উন্নতি ঘটে তাদের মুখের বুলির,শক্তি মিলে চিন্তা করার।

ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ শিক্ষা চালু হওয়ার পর যেমন মুসলমানরা নিজেদের বদ্ধমূল ধারণার জন্য প্রথমদিকে এই শিক্ষাগ্রহণ করতে চায় নি,হতে পারে আদিম সমাজেও কোন বদ্ধমূল ধারণার কারণে কিছু মানুষ আগুনের ব্যবহার ও চাষাবাদ থেকে পিছিয়ে ছিল।আবার জীবনধারনের তাগিদে,সুস্থভাবে বাঁচার জন্য আদিম মানুষেরা নিজেদের মধ্যে দলনেতা তৈরি করতো। এ থেকেও সমাজে উঁচু, নিচু শ্রেণির ধারণা জন্মলাভ করতে পারে।

দিন দিন মানুষ সভ্যতার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল আর অনুভব করল সমাজের সকল শ্রেণির মানুষ একসাথে থাকতে পারে না। এক শ্রেনির মানুষের করুণা,ঘৃণা,তাচ্ছিল্য, আদেশ পালনের জন্য আরেক শ্রেণির মানুষের দরকার। এভাবেই হয়ত ধীরে ধীরে সমাজে গড়ে ওঠে এক ভয়াবহ শ্রেণিবৈষম্য। এই শ্রেণিবৈষম্য মধ্যযুগে পুরোপুরি অর্থনির্ভর হয়ে ওঠে। 

 

দারিদ্র্য ও অন্যায্যতা হিন্দুদের যে চারটি বর্ণ (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র) সমাজে দেখা দেয় এগুলোও মূলত অর্থনৈতিক কারণেই। বৈশ্য আর শূদ্র রা ব্যবসা ও অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে নিয়োগ থাকলেও তারা ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের তুলনায় ছিল অর্থনৈতিক ভাবে অসচ্ছল, তাদের জীবনযাত্রার মানও ছিল খুবই খারাপ। তাই সেকালে তারাও দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকত। শুধু তাই নয়, ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রা তাদের এত নিচু করে দেখত যে, কোন বৈশ্য বা শূদ্র আশেপাশে থাকলে তারা খাবার গ্রহণ করতো না।

জীবনধারণের তাগিদে দলবদ্ধভাবে বসবাস করার ধারণা থেকে রাজ্য সৃষ্টি হল। রাজ্য চালনার জন্য প্রয়োজন রাজা। রাজা ও রাজ্য ধারণাটির উৎপত্তি হয় মূলত প্রজাদের মঙ্গলার্থে। কিন্তু প্রকৃত অর্থে রাজ্য শাসনের ভার যাদের উপর দেয়া হল তারা হয়ে উঠল অতি উচ্চ শ্রেণি। প্রজারা চাইলেও সহজে তাদের রাজার দেখাই পেতো না।
ব্রাহ্মণ রা নিযুক্ত ছিল ধর্মকর্মে আর ক্ষত্রিয়রা রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে। তাই এই দুই শ্রেণি সমাজের অতি উচ্চ শ্রেণি হওয়ায় রাজ্যের ধন-সম্পত্তিও পুঞ্জিভূত হতে থাকে এদের কাছেই। অথচ ধন-সম্পদ যাদের কারণে লাভ করত সেই বৈশ্য -শূদ্ররাই ভালভাবে জীবনযাপন করতে পারত না, পেতো না তাদের ন্যায্য সম্মান অধিকার। এরকম সমাজের এক শ্রেণির মানুষের অর্থ পুঞ্জিভূত করার তাড়নার জন্যই পৃথিবীতে দারিদ্র‍্য এক ভয়ংকর রূপে আবির্ভূত হয়েছে । এখন আর বর্ণপ্রথা না থাকলেও সমাজে রয়ে গেছে উঁচু, নিচু প্রভেদের দেয়াল, আর রয়ে গেছে দারিদ্র্য।

তাই পৃথিবীর ৯০ ভাগ সম্পত্তি বা অর্থ ভোগ করে মাত্র ১০ শতাংশ মানুষ আর বাকি ১০ ভাগ ভোগ করে ৯০ শতাংশ মানুষ।
 
 
 

৩.
যদি কেউ আপনাকে প্রশ্ন করে মানুষ কেন শিক্ষাগ্রহণ করে আর আপনি যদি উত্তরে জ্ঞান লাভ, মহৎ কর্ম, সমাজসেবা করার জন্য বলে থাকেন । তবে তা বাংলাদেশের মত দেশগুলোর প্রেক্ষাপটে কেবলই বলার জন্য বলা। শুনতে মধুর হলেও বাস্তব জীবনে এগুলো হাস্যকর। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালে দেখা যায় এখানে জ্ঞান অর্জনের চেয়ে সার্টিফিকেট অর্জনকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকে মানুষ। কারণ হলো অর্থ, সমাজের উঁচু শ্রেণিতে আসীন হওয়া। কিন্তু সার্টিফিকেট হাতে আসলেই যে তারা সমাজের তথাকথিত উঁচু শ্রেণির কর্মে নিয়োজিত হবে তাও কিন্তু নয়। সার্টিফিকেট চাকরির পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার একটি উপাদান মাত্র। সার্টিফিকেট অর্জন করেও শিক্ষার্থীরা বেকার থাকে,এমনকি চাকরিজীবীর চেয়ে বেকারের পরিমাণই বেশি থাকে এদেশে।
 
সেটাই স্বাভাবিক, এখানে মানুষ শুধুমাত্র ভাল একটি চাকরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করে। কিন্তু যে পরিমাণ ডিগ্রীধারী এদেশে আছে তার অর্ধেক কর্মক্ষেত্রও নেই। তারপরও সবাই ওই এক জিনিসের পিছনেই পরে থাকে। এদেশের মানুষ খুব বেশি অনুকরণপ্রিয়। নিজের কিছু করার তাগিদ নেই কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের স্রোতে ভেসে যাওয়ার গৌরব আছে। পড়াশোনা শেষে পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্র নেই জেনেও সবাই দলবেঁধে বিসিএস,ব্যাংকে চাকরি এইসব এর জন্য পরীক্ষা দিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে । এখানকার বেশিরভাগ যুবক ই ২৫-৩০ বছর বয়সের মধ্যেও চাকরি জোগাড় করতে পারে না। এইসব শিক্ষার্থীরা যদি কোন স্বচ্ছল ও ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ ও করে থাকে তবুও সামগ্রিকভাবে নিজেদের দেশের অর্থনীতিতে ২৫-৩০ বছর পর্যন্ত কোন অবদান রাখে না। যা দেশকে দিন দিন দারিদ্র‍্যের কষাঘাতে পিষ্ট করছে।


সৃষ্টির শুরু থেকেই বা হয়ত সভ্যতার অগ্রগতি থেকে নারী এই পৃথিবীতে হয়ে উঠেছে অধিকার বঞ্চিত। কারণ অনেকে মনে করেন , সন্তান জন্মগ্রহণ পদ্ধতিতে পিতার অংশগ্রহণ সম্পর্কে যতদিন জানা ছিল না ততদিন নারীরা অর্থনৈতিক বিভিন্ন কর্মকান্ডে অংশগ্রহণ করত। কিন্তু এরপর থেকে হাজারো বছর নারী পায় নি কোন স্বাধীনতা, লাভ করেনি অর্থনৈতিক মুক্তি।
দারিদ্র্য ও অন্যায্যতা ‘নারীদের মধ্য কোন দান্তে নেই, শেক্সপিয়র নেই, মধুসূদন-রবীন্দ্রনাথ নেই, নিউটন -আইনস্টাইন নেই, ভিঞ্চি – পিকাসো নেই, প্লাতো-আরিস্ততল-মার্ক্স নেই, কোন প্রেরিত পুরুষ তো নেই-ই; কিন্তু সত্য হচ্ছে পুরুষের মধ্যেও এদের মানের লোক বেশি নেই ; এবং প্রশ্ন হচ্ছে থাকবে কি করে? নারীরা আজও পুরুষদের থেকে নিকৃষ্ট; এর কারণ এ নয় যে তারা সহজাতভাবেই নিকৃষ্ট, এর কারণ তাদের নিকৃষ্ট হয়ে থাকতে বাধ্য করেছে। ‘- হুমায়ুন আজাদ।

নারী গ্রন্থে হুমায়ুন আজাদ খুব সূক্ষ্মভাবেই দেখিয়ে গেছেন যে সুযোগ না পাওয়ার কারণে নারীরা ঠিক কতটা পিছিয়ে। যদিও নারীরা দিন দিন একটু একটু করে সমাজে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ কেড়ে নিচ্ছে। কিন্তু প্রাচ্যের দেশগুলোতে সকল শ্রেণির মানুষের ‘নারী’ কে নিয়ে যে চিন্তাভাবনা তার বদল ঘটতে হয়ত আরো হাজারখানেক বছর লেগে যাবে বা দেখা যাবে হয়ত হাজার বছর পরেও কিছু পরিবর্তন হয় নি, সব হয়ত আরো বিগড়ে গেছে। ভবিষ্যৎ কে-ই বা বলতে পারে,সবটাই অনুমান। তবে এটাও সত্য যে যতদিন না নারী অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পাচ্ছে, কর্মক্ষেত্রে ন্যায্য সম্মান ও মজুরি পাচ্ছে ততদিন পর্যন্ত ‘দারিদ্র্য’ কাউকে ছাড়বেনা। নারীকে দেবী রূপে লক্ষ্মীর সাথে তুলনা করা হয় ঠিক ই;কিন্তু বাস্তবিক রূপে সে যদি দেবী লক্ষ্মীর ন্যায় সমাজের অর্থনীতির চাকায় হাত না লাগায় তবে যেকোন দেশ সেইসব দেশ থেকে পিছিয়ে থাকবে যেই দেশগুলোতে পুরুষের পাশাপাশি নারীও কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ পায়।

‘ন্যায্যতা’ কথাটি বর্তমান সমাজের নারীদের অবস্থার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা যাক। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দুই জায়গাতেই এখন মোটামুটি নারীরা অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগ অর্জন করেছে। সুযোগ লাভ করতে পারলেও যেটা পারে নি তা হল ন্যায্যতা। আজও ডাক্তার,পুলিশ,সৈনিক,ইঞ্জিনিয়ারিং, সাংবাদিকতা ইত্যাদি পেশায় নারীর চেয়ে পুরুষ অনেক বেশি সুবিধা ভোগ করে।কিছু কিছু পেশায় ত নারীর প্রবেশাধিকার ই নিষেধ।

বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপটে এই নারীর ক্ষমতায়নের জন্য একটি সমাজে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলতে পারে কোন জিনিসটি?উত্তর হতে পারে ‘চলচ্চিত্র’। একটি ভালো সিনেমা একজন দর্শকের চিন্তাভাবনা ও মানসিক উন্নতির জন্য খুব বেশি কার্যকর। তাহলে একটু সেই চলচ্চিত্র জগতের দিকেই তাকানো যাক।
 
 
তারা চলচ্চিত্র তৈরি করে নারীর ক্ষমতায়নের। তবে যেই সমস্ত নারী সেইসব চলচ্চিত্রে কাজ করেন তারা পুরুষের সমান পারিশ্রমিক পান না। একজন অভিনয় শিল্পী যদি নারী হন আর পুরুষের চেয়ে ভালো অভিনয় করে দেখাতে পারেন । তথাপি বলিউড, হলিউড এর মত জায়গাতেও মেয়েটিরই পারিশ্রমিক কম হয়। যতদিন সমাজের অর্ধেক মানুষ অর্থনীতিতে ন্যায্যতা লাভ করবে না ততদিন সেই সমাজের দারিদ্র‍্যও বিমোচন হবে না। যেই দেশ যত তাড়াতাড়ি এই বিষয়টি উপলব্ধি করতে পারবে সেই দেশ তত তাড়াতাড়ি অর্থনীতিতে স্বচ্ছল হতে থাকবে।

শ্রমিকশ্রেণির প্রাপ্য সম্মান না পাওয়া, প্রাপ্য মজুরি না পাওয়া, অনুকরণপ্রিয়তা,বেকারত্ব, আমলাতন্ত্রের দুর্নীতি, নারীর বন্দীদশা, নিচু মানসিকতা, অর্থ পুঞ্জিভূতকরণ ইত্যাদি যতদিন সমাজ থেকে দূর হবে না ততদিন সমাজে রয়ে যাবে অন্যায্যতা, রয়ে যাবে দারিদ্র্য। তবে দুঃখের বিষয় এই যে, দারিদ্র্য ও অন্যায্যতা নামক দুইটি দানব দিন দিন তাদের ই গ্রাস করে যারা ইতোমধ্যে এর অন্ধকারে ডুবে আছে।
দারিদ্র্য ও অন্যায্যতা

 
 
 
 
 
লেখক : শিক্ষার্থী
২য় বর্ষ (২৪ তম ব্যাচ)
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
 
 

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*