গণমাধ্যমের উৎপত্তি ও বিকাশ। হাতে লেখা যুগ থেকে শুরু করে বর্তমান ইন্টারনেট যুগ পর্যন্ত | cajbd.com

হাতে লেখা যুগ থেকে শুরু করে বর্তমানের ইন্টারনেট যুগ পর্যন্ত বৈশ্বিক পরিসরে বিভিন্ন গণমাধ্যমের উৎপত্তি ও বিকাশ 

আদিমসমাজ থেকে সভ্য সমাজে আরোহণকারী মানুষের ইতিহাস হচ্ছে যোগাযোগেরই ইতিহাস। সামাজিক পরিবেশে মানুষের এই যোগাযোগ প্রক্রিয়ার নিয়ন্ত্রক হিসেবে ছিল ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজপ্রাসাদের কর্তৃত্বপূর্ণ আচরণ। কর্তৃত্বপূর্ণ এই আচরণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতো হাতে লেখা যোগাযোগীয় মাধ্যম। কিন্তু, পঞ্চদশ শতকে এই হাতিয়ারের কর্তৃত্ব খর্ব করে আবির্ভাব ঘটে গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্রের। শুরু হয়, গণমাধ্যমের যুগ। আর এই গণমাধ্যম উৎপত্তি ও বিকাশের চলার পথে পথে হাজির হয়েছে ইন্টারনেট যুগ।

Media

গণমাধ্যমের ধরনঃ

ধরন বিবেচনায় গণমাধ্যম প্রধানত দুই প্রকার। যথা,

ক) পুরানো গণমাধ্যম

এবং

খ) নতুন গণমাধ্যম।

পুরানো গণমাধ্যম আবার তিন ধরনের।

এগুলো হলোঃ

১. মুদ্রণ মাধ্যমঃ বই, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন, সাময়িকীপত্র, লিফলেট, পোস্টার, স্টিকার ইত্যাদি মুদ্রণ মাধ্যমের অন্তর্ভুক্ত।
২. শব্দ মাধ্যমঃ রেডিও, রেকর্ড, টেপরেকর্ডার ইত্যাদি।
৩. গতি মাধ্যমঃ চলচ্চিত্র , টিভি সম্প্রচার, ভিডিও ইত্যাদি।

অন্যদিকে, নতুন মাধ্যমের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে ইন্টারনেট ভিত্তিক মাধ্যমগুলো।

হাতেলেখা থেকে ইন্টারনেট যুগ পর্যন্ত বিভিন্ন গণমাধ্যমের উৎপত্তি ও বিকাশঃ

হাতেলেখা যুগ থেকে শুরু করে বর্তমানের বৈশ্বিক পরিসরে বিভিন্ন গণমাধ্যমের উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে আলোচনা করা হলঃ

মুদ্রণ মাধ্যম হিসেবে বইঃ
ম্যাককুইল তাঁর ‘Mass communication theory’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, মুদ্রিত বইয়ের সাথেই আধুনিক গণমাধ্যমের ইতিহাস শুরু হয়। যা ছিল রীতিমত একটি বিপ্লব। মুদ্রিত গণমাধ্যমের মধ্যে বই হচ্ছে আদি গণমাধ্যম। পার্থ চট্টোপাধ্যায় ‘গণজ্ঞাপনে’ বলেন সারা পৃথিবীতে প্রতিবছর ৩ কোটি বই ছাপা হয়।

বইয়ের উৎপত্তিঃ
মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের আগে বই গণমাধ্যমে রূপ নেয়নি। পণ্ডিতেরা অনুমান করেন খ্রিস্টজন্মের অনেক আগে মিশর, সুমেরিয়া ও ব্যাবিলনের লোকেরা পাথরের ওপর ছবি খোদাই করে বক্তব্য প্রকাশের চেষ্টা করতো। চীনারা গাছ থেকে তৈরি কালি দিয়ে বাঁশ ও কাঠের ওপর লিখতো সম্ভবত প্রথম বই লেখা হয়েছিল এমন কয়েক টুকরা বাঁশের ওপর। পরবর্তীকালে চীনারা কাগজ আবিষ্কার করে। পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, তবে চৌদ্দ শতকের আগ পর্যন্ত ইউরোপে কোন কাগজের প্রচলন ছিল না। ১৪৫৬ সালে জার্মানির গুটেনবার্গ মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কার করে সর্বপ্রথম মুদ্রিত বই বাইবেল প্রকাশ করেন। এর আগে বই রচনা করা ধর্মযাজকদের মধ্যে এবং পাঠ করা মুষ্টিমেয় লোকের হাতে সীমাবদ্ধ ছিল।
কারণ হিসেবে ম্যাককুইল বলেন, ‘বইকে তখন যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হত না। বরং এটিকে জ্ঞানকোষ এবং বিশেষ করে ধর্মীয় বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হত, যাকে পবিত্র রাখতে হবে।’ হাতেলেখা এ সকল বইকে তখন মোটা কভার দিয়ে বাঁধা হত।
গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের পর বই গণমাধ্যম হিসেবে প্রচলিত হয়। কারণ একটি পাণ্ডুলিপিকে তখন হাজার হাজার কপিতে রূপান্তরিত করে ব্যাপক মানুষের কাছে ছড়িয়ে দেয়া সম্ভব হয়ে ওঠে।

১৪৭৬ সালে উইলিয়াম ক্যাকমটন ব্রিটেনে প্রথম পুস্তক প্রকাশনা শুরু করেন। তাঁর প্রকাশিত প্রথম বই হোমারের ইলিয়াড।

বইয়ের বিকাশঃ
১৫০০ সালের মধ্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ৩৫ হাজার কপি মুদ্রিত বই প্রচারিত হয়েছিল। তবে বই প্রকাশের সেই আদিকাল সুখের ছিল না। মুদ্রিত বইয়ের ক্ষমতা সম্পর্কে সচেতন হয়েই ইংল্যান্ডের অষ্টম হেনরি বই ছাপা নিয়ন্ত্রণের জন্য লাইসেন্স প্রথা চালু করেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বই ছাপা শুরু হয় ১৬৪০ খ্রিস্টাব্দে এবং ১৮২০ সালের মধ্যে দেশটি থেকে ৫০ হাজার টাইটেল প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে ভারতীয় উপমহাদেশে ১৫৫৬ থেকে ১৬৭৪ সালের মধ্যে গোয়া প্রেস থেকে ৩৪টি বই ছাপা হয়েছিল।

গণমাধ্যম হিসেবে বইয়ের বিকাশের আধুনিক যুগঃ
এখন বই হচ্ছে একটি গণমাধ্যম পন্য। ইউনেস্কোর হিসাব মতে, ১৯৫৫ সাল থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে বইয়ের উৎপাদন তিনগুণ বেড়েছে। ১৯৭৫ সালে সোভিয়েত-রাশিয়াতে ৮৩ হাজার বই প্রত্যাশিত হয়েছে। গ্রেট ব্রিটেন বছরে প্রকাশ করে দশ কোটি পাউন্ড মূল্যের বই। বই উৎপাদনে ইউরোপ সবচেয়ে এগিয়ে। বিশ্বের মোট উৎপাদনে ৪৮.৩ ভাগ বই সেখানে প্রকাশিত হয়। অন্যদিকে এশিয়ায় প্রকাশিত হয় শতকরা মাত্র ১৪.৫ ভাগ বই।

মুদ্রণ মাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্রঃ
মুদ্রিত গণমাধ্যম হিসেবে সংবাদপত্র বের হওয়ার অনেক আগেই সংবাদপত্রের ধ্যান ধারণার প্রচলন ছিল। জুলিয়াস সিজারের আমলে, খ্রিস্টপূর্ব ৫০ সালে, প্রাত্যহিক দিনলিপির বিবরণযুক্ত দেওয়ালে সেঁটে দেয়া হাতেলেখা Acta-Diurna কে অনেক সংবাদপত্রের আদিরূপ মনে করেন। মধ্যযুগের বেনিসে হাতেলেখা সংবাদপত্রের প্রচলন ছিল। তবে মুদ্রিত সংবাদপত্রই হয়ে ওঠে একটি গণমাধ্যম। কারণ হাতেলেখা সংবাদপত্রের প্রকাশ নিয়মিত করা সম্ভব হয়নি।

কাগজে মুদ্রিত সংবাদপত্রের উৎপত্তিঃ
কাগজে মুদ্রিত সংবাদপত্রের প্রথম প্রকাশ হয় ৪০০ বছরেরও বেশি সময় আগে। ১৬০৫- ১৬১০ সালের মধ্যে পৃথিবীর প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র ‘Nieuwe Tidingen’ প্রকাশিত হয়। সম্ভবত জার্মানিতে পত্রিকাটির জন্ম।

ইংল্যান্ড ১৬২২ এবং ফ্রান্স ১৬৩১ সালে প্রথম সংবাদপত্র প্রকাশ করে।
স্বাধীন আমেরিকার প্রথম সংবাদপত্র ‘Boston newsteller’ ১৮০৪ সালে প্রকাশিত হয়।
আর পৃথিবীর প্রথম দৈনিক সংবাদপত্র ‘Wiench zeitung’ ১৭০৩ সালে ভিয়েনা থেকে প্রকাশিত হয়।

ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম মুদ্রিত সংবাদপত্র হিকির ‘বেঙ্গল গেজেট’ ১৭৮০ সালের ২৯ শে জানুয়ারি প্রকাশিত হয়।
১৭৬৬ সালের আগ পর্যন্ত সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছিল না। সুইডেন প্রথম সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে আইন পাশ করে।

মুদ্রিত সংবাদপত্রের বিকাশধারাঃ
উৎপত্তির পর বিকাশের পথে মুদ্রিত সংবাদপত্র নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। প্রথমদিকে সংবাদপত্র বাণিজ্যিক ভিত্তিতে প্রকাশিত হয়নি এবং এতে সংবাদের নামে এমন বিষয় ছাপানো হতো যা আদৌ সংবাদ নয়। সম্পাদনা সম্পর্কে সম্পাদকের ধ্যান ধারণাও স্পষ্ট ছিল না। তখন সংবাদ সংগ্রহ ও তা আকর্ষণীয়ভাবে লেখা ও সাজানোর জন্য কোন দৃষ্টি দেয়া হয়নি। তাছাড়া বহুদিন পর্

তাছাড়া বহুদিন পর্যন্ত সংবাদ রচনার কোন নিজস্ব নীতিও গড়ে উঠেনি। এদিকে ১৬৪১ সালের আগে ইংল্যান্ডের সংবাদপত্রে ইংল্যান্ডের খবর ছাপানো নিষিদ্ধ ছিল, সংবাদপত্র শুধু বিদেশের খবর ছাপাতো।

ঊনবিংশ শতাব্দীর শিল্পবিপ্লবের সাথে সাথে সংবাদপত্রের ক্ষেত্রেও বিপ্লব ঘটে। চাহিদা বাড়ার সাথে সংবাদপত্রের সংখ্যা ও প্রচারসংখ্যা বেড়ে যায়। বাণিজ্যের প্রসারের সাথে সংবাদপত্রের বিজ্ঞাপনও বাড়তে থাকে। বিংশ শতকে ক্রমে সংবাদপত্র সত্যিকারের গণমাধ্যম হয়ে ওঠে। কিন্তু তা সত্ত্বেও ম্যাককুইল বলেন, There are still quite large intercountry differences in the extent of newspaper reading. নরওয়ে প্রতি ১০০০ জনে ৭২০ জন, সুইজারল্যান্ডে ৪৫৪ জন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২৬৩ জন এবং গ্রীসে ৭৬ জন সংবাদপত্র পড়ে।

আবার সংবাদপত্রের ধরণের দিক থেকে ভাগ রয়েছে।
এগুলো হলোঃ

1. The party-political press:
রাজনৈতিক আদর্শভিত্তিক পত্রিকা যেটি রাজনৈতিক সংগঠনের কর্মীদেরকে উৎসাহিত করছে ও তথ্য জানাতে প্রকাশিত হয়, তা-ই party – political press. বাণিজ্যিক সংবাদপত্রের কাছে party press তার অবস্থান হারালেও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এই সংবাদপত্রের ধারণা এখনো প্রচলিত আছে। এই ধরণের সংবাদপত্রের উদাহরণ হিসেবে রুশ বিপ্লবের সময় রাশিয়ায় প্রকাশিত ‘ভ্যানগার্ড প্রেস’ এর কথা বলা হয়।

2. The prestige press:
এই সংবাদপত্রের মাধ্যমে নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে উন্নত-চিন্তা তুলে ধরা হয়। এই সংবাদপত্রের মাধ্যমে সাংবাদিকতা পেশাকে বস্তুনিষ্ঠতার জন্য ব্যবহার করা হয়। অনেক দেশে দু একটি পত্রিকা এই ধরণের বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখতে চেষ্টা করে।

3. The popular press :
এই ধরণের সংবাদপত্র বাণিজ্যিক উদ্যোগে গড়ে উঠে। উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার পাঠকের আগ্রহ, কম খরচে উৎপাদন বিজ্ঞাপন থেকে আয় ইত্যাদি বিষয় এ ধরণের পত্রিকায় বিবেচনা করা হয়। সংবাদ হিসেবে এ ধরণের সংবাদপত্রে অপরাধ, দূর্যোগ, যুদ্ধ, সেলিব্রেটি ইত্যাদিকে বেছে নেয়া হয়।

অন্যান্য মুদ্রণ মাধ্যমঃ
অন্যান্য মুদ্রণ মাধ্যমে রয়েছে প্যাম্পলেট, কমিকস, ম্যাপ, পোস্টার, হ্যান্ডবিল, দেওয়াল পত্রিকা, ম্যাগাজিন ইত্যাদি। এগুলোর মধ্যে ম্যাগাজিন অষ্টাদশ শতকের শুরু থেকেই ব্যাপক বৈচিত্রতা ও প্রচুর পাঠক সৃষ্টি করে আসছে। তাছাড়া ম্যাগাজিনের সংখ্যা সংবাদপত্রের চেয়েও বেশি। পার্থ চট্টোপাধ্যায় ১৯৭৫ সালে একটি হিসাব তুলে ধরে বলেন, পৃথিবীতে যেখানে আট হাজার দৈনিক সংবাদপত্র প্রতিদিন প্রকাশিত হয় সেখানে ম্যাগাজিনের সংখ্যা চার লক্ষ ১০ হাজার। বিংশ শতকের প্রথম দিকে গণমাধ্যম হিসেবে ম্যাগাজিনের গুরুত্ব আজকের দিনের চেয়েও বেশি ছিল। তা সত্ত্বেও এর প্রভাব নিয়ে যোগাযোগ গবেষণায় তেমন গুরুত্ব দেখা হয়নি। বর্তমান বিশ্বে সংবাদ ম্যাগাজিন হিসেবে নিউজ ইউক, ইন্ডিয়া টুডে উল্লেখযোগ্য। আমেরিকার টাইম ম্যাগাজিনের প্রচার সংখ্যা চার লক্ষ। অন্যদিকে সারাবিশ্বে প্রতিবছর রাজনৈতিক, সামাজিক প্রচার ও প্রচারণার জন্য প্রচুর পোস্টার, হ্যান্ডবিল মুদ্রিত হয়।

গণমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রঃ
ঊনিশ শতকের শেষে প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে চলচ্চিত্রেরও আবির্ভাব ঘটে। ফ্রান্সের ল্যুমের, ইংল্যান্ডের আর ডব্লিউ পাল ও আমেরিকার টমাস আলভা এডিসন প্রথম মুভি ক্যামেরা তৈরি করেন। বিশ শতকে পড়তে না পড়তেই বহু দেশ দেখাতে শুরু করে নির্বাক ছবি। ১৯০৩ সালে আমেরিকায় ‘গ্রেট ট্রেন রবারি’ নামে প্রথম একটি কাহিনীচিত্র তোলা হয়।১৯১৫ সাল পর্যন্ত চলচ্চিত্র ছিল মঞ্চাভিনয়েরই চিত্ররূপ। টুকরো টুকরো ঘটনার ছবি তুলে সম্পাদনার সময় সেগুলিকে জুড়ে দেয়ার রীতি আগে ছিল না। ১০০ বছরেরও বেশি সময়ের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় গণমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র আজকের অবস্থায় এসেছে। তবে এই পথ চলার সময় তাকে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করতে হয়েছে টেলিভিশনের সাথে। যার ফল হিসেবে দেখা গিয়েছে, ১৯৫৬ সালে গ্রেট ব্রিটেনে যেখানে ৪৩৪৯টি সিনেমা হল ছিল, ১৯৬৭তে তা এসে দাঁড়ায় ১৮৫১টিতে। বর্তমানে অবশ্য চলচ্চিত্র তৈরি করা হয় টেলিভিশনের দর্শকদেরকে উদ্দেশ্য।

সম্প্রচার মাধ্যম হিসেবে টেলিভিশন ও রেডিওঃ
সম্প্রচার মাধ্যম হিসেবে রেডিওর আশি এবং টেলিভিশনের পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাস রয়েছে। দর্শক শ্রোতার উপর এই দুটি গণমাধ্যমেরই রয়েছে শক্তিশালী ভূমিকা। এই কারণে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এগুলোর উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। প্রথমদিকে অবশ্য টেলিভিশন যে গণমাধ্যম হয়ে উঠবে তা বোঝা যায়নি। ১৯৩৯ সালের আগে ব্রিটেনে মাত্র ৩০০ টেলিভিশন সেট ছিল। টেলিভিশনের জয়যাত্রা শুরু হয় ষাটের দশকে। ১৯৫৩ সালে আসে রঙিন টেলিভিশন।

অন্যদিকে রেডিওকে প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল বন্দরের সাথে সমুদ্র ভাসমান জাহাজের যোগাযোগের জন্য। তবে ১৯২০ সালে বিশ্বের প্রথম বেতার সম্প্রচার স্টেশন উদ্বোধন হয় আমেরিকায়।

বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রেডিও ও টেলিভিশনকে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পণ্যের বিক্রির উদ্দেশ্যে উভয় মাধ্যমের অনুষ্ঠানগুলোর আলোকেই উপস্থাপন করা হচ্ছে। বর্তমানে ১৯৮০ সালে প্রকাশিত ম্যাকব্রাইড কমিশনের রিপোর্ট অনুসারে বিশ্বের ১৩৮টি দেশে টিভি গ্রাহকের সংখ্যা ৪০ কোটি। নিশ্চিতভাবে বর্তমানে এ সংখ্যা আরো অনেক বেড়ে গেছে।

রেকর্ড মিডিয়াঃ
গণমাধ্যম তত্ত্বে ও গবেষণায় রেকর্ড মিডিয়া হিসেবে গানের প্রতি মন মনোযোগ দেয়া হয়েছে। সম্ভবত সমাজে এর প্রয়োগ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকার কারণে এমন হয়েছে।
গান রেকর্ড করে তা পুনরায় চালানোর পদ্ধতি ১৮৮০ সালে শুরু হয়। জনপ্রিয় গান ও সুরের প্রতি মানুষের আকর্ষণের কারণে রেকর্ড দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে এটি অন্যতম গণমাধ্যম যা মানুষকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। অনেক দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে গানের ভূমিকা থেকেই এটি বোঝা যায়। বর্তমানে বিশ্বে রেকর্ডেড গানের বড় বাজার রয়েছে। রেকর্ড প্লেয়ার, সিডি প্লেয়ারের মাধ্যমে এগুলা বিক্রি হয়। আবার রেকর্ডেড গান, সম্প্রচার মাধ্যমেও ব্যবহার করা হচ্ছে।

ইন্টারনেটঃ
নতুন মাধ্যম হিসেবে ইন্টারনেটের আবির্ভাব ঘটে ১৯৯০এর দশকে Wor wide web বা WWW আবিষ্কারের সাথে সাথে ইন্টারনেটের যাত্রা শুরু হয়। কম্পিউটার ভিত্তিক এই মাধ্যম প্রথমদিকে ব্যবহার

কম্পিউটার ভিত্তিক এই মাধ্যম প্রথমদিকে ব্যবহার করা হতো অফিসিয়াল কর্মীদের মধ্যে আন্তঃযোগাযোগের জন্য। কিন্তু, মুনাফার্জন করার মতো সেবা ও পণ্যের বিক্রিতে ভূমিকা রাখতে পারবে এমন সম্ভাবনা থেকে এটিকে গুরুত্ব দেওয়ার পর এর অগ্রগতি ঘটে। বর্তমানে যে হারে ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়ছে তাতে মনে হয় আগামী দিনে এর ব্যবহারকারীদের সংখ্যা টিভিকে ছাড়িয়ে যাবে। ম্যাককুইল বলেন, The fact that uses of Internet are often clearly not mass communication is relevant but not a devising argument.
গণমাধ্যম না হয়ে উঠলেও বর্তমানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে অনলাইন সংবাদপত্র, সামাজিক যোগাযোগ ক্রিয়া, অনলাইন লাইব্রেরি ইত্যাদি ব্যবহার করা যায়। বলা যায়, এটি একটি গণমাধ্যমেরই কাজ।

হাতেলেখা যুগ থেকে ইন্টারনেট যুগ এই দীর্ঘ পথভ্রমণে বৈশ্বিক গণমাধ্যম ব্যবস্থায় ঘটে গেছে নানা পরিবর্তন। ইন্টারনেট যুগ বিশ্বকে নিয়ে এসেছে হাতের মুঠোয়। প্রাযুক্তিক অগ্রগতি এবং এর সাথে মিডিয়া কেন্দ্রীভবন বৈশ্বিক গণমাধ্যম সম্পর্কে আমাদের সামনে নিয়ে আসছে নানান প্রশ্নের সমাহার। এর মধ্যে অন্যতম প্রশ্ন, বৈশ্বিক গণমাধ্যম কি স্বাধীন?

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*