কাঙাল হরিনাথ ।Kangal Harinath । cajbd.com

মোহাম্মাদ সাকিব হক

কাঙাল হরিনাথ (KangalHarinath)

শ্রী হরিনাথ মজুমদার ওরফে কাঙ্গাল হরিনাথ। কুষ্টিয়া জেলার গড়াই তীরবর্তী কুমারখালী গ্রামে ১২৪০ বঙ্গাব্দ ও ২২ জুলাই ১৮৩৩ ইং সালে জম্মগ্রহণ করেন। শৈশবে পিতা-মাতাকে হারানোর পর বেশি লেখাপড়া করতে পারেননি।

 উনিশ শতকে বাঙালি সমাজে যে জাগরণ ঘটে, বিশেষ করে গ্রামীণ পর্যায়ে, তার অন্যতম প্রধানপুরুষ ছিলেন কাঙাল হরিনাথ(১৮৩৩-৯৬)। কুষ্টিয়াকে আজ যে আমরা সাংস্কৃতিক রাজধানী বলি তার পেছনে বাংলার এই বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্বের বিশেষ অবদান রয়েছে। এই আধুনিকতম যুগে এসেও যেখানে কুষ্টিয়াতে ভালো মানের ছাপাখানা নেই, পত্রিকা নেই, সেখানে ১৮৬৩ সালের এই এপ্রিল মাসেই কুমারখালি থেকে গ্রামবার্তা প্রকাশিকা নামে একটি মাসিক পত্রিকা যাত্রা শুরু হয় তার হাত ধরে।

পত্রিকাটি প্রথমে মাসিক প্রকাশিত হলেও কিছুদিন পরে এটি সাপ্তাহিক হিসেবে প্রকাশিত হতে থাকে। পত্রিকাটি দীর্ঘ ২৫ বছর প্রকাশিত হয়।এ সময় কাঙ্গাল হরিনাথ একাধারে সংবাদ সংগ্রহ করতেন, সম্পাদনা করতেন এবং পত্রিকা প্রকাশ করতেন। আবার নিজেই পত্রিকা পাঠকের দ্বারপ্রান্তে দিয়ে আসতেন এবং অর্থ সংগ্রহ করতেন। অথাৎ ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকার’ হকার, রিপোর্টার,  সম্পাদক, প্রকাশক সবই ছিলেন কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার।
তৎকালীন ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকার মাধ্যমে ইংরেজ শাসন, নীলকরদের নির্যাতন, জোতদার, মহাজন ও পুলিশের অত্যাচার-নির্যাতনের কথা নিয়মিত ভাবে প্রকাশ করা হতো। 
কাঙ্গাল হরিনাথের নি:স্বার্থ, প্রতিবাদী, সাহসী লেখনী বন্ধ করতে পারেনি ইংরেজ শাসন ও নীলকর, জোতদার মহাজনরা। শত বাধা উপেক্ষা করে তিনি নিঃস্বার্থভাবে লিখেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে।
নিয়মিত ১০ বছর কলকাতা থেকে প্রকাশের পর ১২৮০ বঙ্গাব্দে মথুরানাথ ছাপাখানা (এমএনপ্রেস) নামের প্রেস স্থাপন করেন কাঙ্গাল হরিনাথ। 
মথুরানাথ এমএন প্রেস স্থাপন করলেও পত্রিকা প্রকাশে কখনও সচ্ছলতা আসেনি তার। কৃষক-প্রজা, শ্রমজীবী মানুষ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর স্বার্থের অনুকূলে নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও মাসিক, পাক্ষিক ও সাপ্তাহিক হিসেবে ২৫ বছর একটানা প্রকাশিত হয় গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা। কিন্ত শেষ পর্যন্ত মাত্র ৭ টাকা ঋণের দায়ে ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়।  
১৮৯৬ সালের ১৮ এপ্রিল গ্রামীণ সাংবাদিকতার প্রবাদপুরুষ কাঙ্গাল হরিনাথ ৬৩ বছর বয়সে মারা যান।
তৎকালীন পাবনার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মি. থামফ্রে ফাঈম কাঙ্গাল হরিনাথকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘এডিটর তোমাকে ভয় করি না বটে কিন্তু তোমার লেখনীর জন্য অনেক কুকর্ম পরিত্যাগে বাধ্য হয়েছি।’ 

Know More….সাংবাদিকতার ইতিহাস ও ভারতের সংবাদপত্র । সংবাদপত্রের উদ্ভব ও বিকাশ ১৯০০-১৯২০

এখানে সাংবাদিক হিসেবে কিছুকাল কাজ করেন উপন্যাসিক-নাট্যকার মীর মশাররফ হোসেন। এই পত্রিকায় সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ক প্রবন্ধ নিয়মিত মুদ্রিত হতো। পাশাপাশি কুসীদজীবী ও নীলকর সাহেবদের শোষণের কেচ্ছা-কাহিনীও প্রকাশিত হতো। ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট ও দেশী জমিদারদের অব্যাহত হুমকিও কাঙাল হরিনাথকে এ-কাজ করা থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কুষ্টিয়ার কুমারখালির কাঙাল হরিনাথ মজুমদার গ্রামবার্তা প্রকাশিকা নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করতেন। এরই একটি সংখ্যায় ঠাকুর-জমিদারদের প্রজাপীড়নের সংবাদ ও তথ্য প্রকাশের সূত্র ধরে উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মকর্তারা বিষয়টির তদন্তে প্রত্যক্ষ অনুসন্ধানে আসেন। এতে করে কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ওপর বেজায় ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ঠাকুর-জমিদারেরা। তাঁকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যে লাঠিয়াল পাঠালে শিষ্যদের নিয়ে লালন সশস্ত্রভাবে জমিদারের লাঠিয়ালদের মোকাবিলা করেন এবং লাঠিয়াল বাহিনী পালিয়ে যায়। এর পর থেকে কাঙাল হরিনাথকে বিভিন্নভাবে রক্ষা করেছেন লালন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার নিরিখে প্রায়-অশিক্ষিত এই প্রাজ্ঞজন বন্ধুদের সাহায্যে ১৮৫৫ সালে নিজ গাঁয়ে একটি ভার্নাকুলার বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর বেশ কিছুদিনঐ বিদ্যালয়ে বিনাবেতনে পড়ান। পরবর্তীকালে তিনি ১৮৫৬ সালে কুমারখালিতে একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন। তার এই বহুমুখী কাজের কারণে কুষ্টিয়ার বাউল গবেষক আবুল আহসান চৌধুরী ‘কাঙাল হরিনাথ বাউলগানের অনুষঙ্গে’ শীর্ষক প্রবন্ধে কাঙাল হরিনাথকে ‘সংবাদ-সাময়িকপত্র পরিচালক, শিক্ষাব্রতী, সমাজ-সংস্কারক, নারীকল্যাণকামী, দেশহিতৈষী, রায়ত-কৃষকপ্রেমী, সাধক ও ধর্মবেত্তা এবং নব্য-সাহিত্যসেবীদের উদার পৃষ্ঠপোষক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

কাঙাল হরিনাথ



হরিনাথ বাউলগানের একটি ভিন্ন ‘ঘরানা’ সৃষ্টি করেছিলেন। লালন-আবিষ্কারে হরিনাথের ভূমিকা পথিকৃতের মতো। তার অনেক গদ্য-পদ্য রচনা থাকলেও খ্যাতির ভিত্তিভূমি হল বাউলগান, যেটি ভীষণভাবে লালনপ্রভাবিত। হরিনাথের মোট গ্রন্থ ১৮টি।

হরিনাথের দুটি গান:

১.
নদী বল্ রে বল্ আমায় বল্ রে।
কে তোরে ঢালিয়া দিল এমন শীতল জল রে \
পাষাণে জন্ম নিলে, ধরলে নাম হিমশিলে,
কার প্রেমে গ’লে আবার হইলে তরল রে।
(ওরে) যে নামেতে তুমি গ’ল, সেই নাম একবার আমায় বল,
দেখি গ’লে কিনা আমার কঠিন হৃদিস্থল রে \
কার ভাবে ধীরে ধীরে, গান কর গভীর স্বরে,
প্রাণমন হরে কিবা শব্দ কল কল রে;
নদীরে তোর ভাবাবেশে, যখন রে বক্ষঃস্থল ভেসে
তখনই বর্ষা এসে ভাসায় ধরাতল রে \

২.
যারা সব জাতের ছেলে, জাত নিয়ে যাক যমের হাতে।
বুঝেছি জাতের ধর্ম, কর্মভোগ কেবল জেতে \
অজাতে জন্ম হোল
মা বাপের নাই জাতকুল
কুলধ্বজ কুলাচার মতে \

অভাব অনটনের মাঝেই বড় হয়ে উঠলেও অবহেলিত সমাজের বৈষম্য তুলে ধরার জন্য এবং তৎকালীন জমিদারের অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে জনসাধারণকে সচেতন করার জন্য ‘গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকা’ নামে পত্রিকাটি প্রকাশ করেন।  সেই পত্রিকায় লেখনীর মাধ্যমেই অবহেলিত মানুষের হ্নদয়ে জায়গা করে নেন কাঙ্গাল হরিনাথ মজুমদার। সাধারণ মানুষের জন্য সারা জীবন সংগ্রাম করে গেছেন। সংগ্রাম করেছেন মানুষের অধিকার আদায়ে জন্য।

লেখক : শিক্ষার্থী
২য় বর্ষ (২০১৭-১৮ সেশন)
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*